Home বিবিধ, গল্প অসময়ের বৃষ্টি
বিবিধগল্প

অসময়ের বৃষ্টি

সুদেষ্ণা চক্রবর্তী

(১)

আজ চারদিন হলো পেডং বেড়াতে এসেছে অরুণিমা।

আমাদের পাশের হোমস্টেতেই উঠেছে। ওর সাথে বেশ বন্ধুত্ব হয়ে গেছে আমার।

একাই এসেছে মেয়েটা।

প্রথমদিন বিকেলবেলা মনাস্ট্রি থেকে ফেরার পথে মেয়েটাকে দেখলাম। গায়ের রঙ গোলাপী আর চোখের রঙটা নীলচে। কি মিষ্টি দেখতে। দেখেই মনে হয় কোনো অভিজাত বংশের মেয়ে।

আহা রে! এত সুন্দর মিষ্টি মেয়েটা একা একা ঘুরতে বেরিয়ে পড়েছে।

কথা বলতে যাবো ঠিক তখনই আমার কর্তা বলে উঠলো “তোমার গায়ে পরে আলাপ জমানোর অভ্যেসটা গেলনা আর তাই না?”

কর্তা তার অভ্যেস অনুযায়ী লম্বা লম্বা পা ফেলে অনেকটা এগিয়ে গেলো। আমি সেই ঢিমেতালে এদিক ওদিক দেখতে দেখতে চলেছি।

হঠাৎ টপ টপ করে দু’ফোঁটা জল আমার হাতে পড়লো।

দু চার মিনিটের মধ্যেই বেশ বড় বড় বৃষ্টির ফোঁটা মাথায় পড়লো।অসময়ের বৃষ্টি তাই ছাতা আনার কথা মাথায় ছিলনা আমাদের কর্তা গিন্নী কারোরই।

ব্যাগের থেকে একটা তিন ভাঁজের ছাতা বের করে মেয়েটি আমাকে ইশারায় ডাক দিল।

সেই হঠাৎ বৃষ্টিতে মেয়েটির সাথে আমার পরিচয়।

 

(২)

পরের দিন সকালটাতে বড্ড তাড়াহুড়ো। লাভা যাব; ড্রাইভার এসে দাঁড়িয়ে আছে মিনিট পনেরো হলো।

আবার সেই কর্তার অভিযোগ মাখানো গলার স্বর “সময় মতন তুমি দেখি কিছুই করতে পারোনা।”

কথা বাড়ালেই কথা বাড়ে।

এগিয়ে এসে বললাম, “দাও দেখি শাড়ির কুঁচিটা ঠিক করে।”

দুজনে একটা সেলফি তুলে গাড়িতে ওঠার সময় চোখাচোখি হলো অরুণিমার সাথে।

বললাম “আজ কোথাও বেরোবে না”?

মুচকি হেসে ইশারায় না বললো মেয়েটি।

সাইডসিন সেরে দু একটা টুকটাক কেনাকাটা করে ফিরে আসতে আসতে প্রায় বিকেল হয়ে এলো। দেখলাম টেরেসে একটা কফিকাপ নিয়ে মেয়েটা বসে।

আমাকে দেখেই মিষ্টি করে হাসলো।

আমি গিয়ে বসলাম ওর পাশের চেয়ারটাতে।

আবারও সেই টুপ করে একটা জলের ফোঁটা কফি কাপে।

মেয়েটি আমাকে ওর জীবনের হঠাৎ বৃষ্টির একটি গল্প বলতে লাগলো।

“পাহাড়ে তো রোদ, মেঘ আর বৃষ্টির লুকোচুরি অহরহ চলতেই থাকে।

ঠিক বছর পাঁচেক আগে আমরা এই পেডং এসেছিলাম প্রথমবার।

সেদিনও  হঠাৎ করেই বৃষ্টি এসে পড়েছিল।

একঘন্টার মুষলধারায় বৃষ্টিতে ওদের আর গাড়ি করে ভিউ পয়েন্টে যাওয়া হয়নি।

“দিদি আপলোগ কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে পেলেন না”….   নেপালি গাড়িচালক ভাইটা আধো আধো বাংলা আর হিন্দি মিশিয়ে বলল……।”

 “এই কাঁচা হাঁটা পথের রাস্তাটা কোথায় যায় ভাই??”

“এটা ধরে ছ’কিমি উপার  উঠলে একটা গীর্জা আছে দিদি…..পয়দল যেতে হবে দিদি লেকিন অনেকটা রাস্তা উঁচাই……”

মেয়েটি কথা শেষ অবধি না শুনেই টিপ টিপ বৃষ্টিতে ছাতা মাথায় হাঁটা দিয়েছিল।

“তুই যাস না, অতোটা হাঁটতে পারবি তো?? সবেতেই জেদ তোর……”

“না পারলে নেমে আসবো, চল শুরু তো করি আগে….”

 হঠাৎ করে যদি জোরে বৃষ্টি আসতে পারে কিন্তু”…..

“এলে দুজনেই ভিজবো”…….সাবলীল উত্তর মেয়েটির।

অগত্যা ছেলেটিও পিছু নিল………।”

এতটুকু বলে থামলো অরুণিমা।

দু’চোখে জল।

আমি মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললাম, “কথা গুলো বলতে যদি তোমার কষ্ট হয় তবে বোলো না”।

বাচ্চাদের মতন ফুপিয়ে কেঁদে উঠলো মেয়েটা।

আমি আর জিজ্ঞেস করিনি কোনো কথা।

তবে মনটা উদগ্রীব ছিল এই ভেবে যে  শেষ পর্যন্ত পৌঁছাতে পেরেছিল কি ওরা দুজনে গীর্জার দোর অবধি?

 

(৩)

রাতে একটা কফির কাপ হাতে খোলা টেরেসে এসে দাঁড়ায় অরুণিমা। বড় ভালো লাগে কিছু কিছু সময় একা থাকতে দূর থেকে ক্ষীণ আলো এসে পড়ছে টেরেসে।

সেই গীর্জার আলো এসে পড়ছে। কাঁচা রাস্তাটা এখন প্রায় অনেকটাই পাকা।

ওইদিন গীর্জা অবধি পৌঁছানোর আগেই সম্বিতের বেশ কষ্ট হয় বুকে। হাঁপিয়ে ওঠে। চোখটা বন্ধ হয়ে আসে।

তড়িঘড়ি ওর হাতটা ধরে ওকে নিচে নামিয়ে নিয়ে আসে অরুণিমা। রাতের দিকে কপালে হাত দিয়ে দেখে গা বেশ গরম।

পরের দিন ভোরবেলায় ওরা নেমে আসে শিলিগুড়ি।

যে ভাবেই হোক কলকাতায় ফিরতে হবে।

আজ বড্ড মনে পড়ছে সম্বিতের কথা ।

ঠিক বছর তিনেক আগের কথা। দিনটা ছিল ১২ই ফেব্রুয়ারি।

অনেক রাত অবধি বই পড়া অরুণিমার বরাবরের অভ্যেস।মা বাপী শুয়ে পড়লে নিরিবিলিতে  ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্পের বই পড়ে অরুণিমা।

রাত প্রায় পৌঁনে বারোটা,হঠাৎ সোনার ফোনে টনক নড়ে।

“জানিস আরু, সম্বিতের  নাকি টানা ছয় মাস ধরে রেডিয়েশন চলছিল। শেষ কেমোটা আর নিতেই পারলনা”।

ফোনে কথাগুলো এক নিঃশ্বাসে বলে গেলো সোমা।

খবরটা শুনে ধপ করে সোফায় বসে পড়ল অরুণিমা।

গত আড়াই বছর ধরে ওর সাথে আর যোগাযোগ নেই সম্বিতের।

পেডং থেকে ফিরে সাতদিন ধরে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ার পরেও যখন সম্বিতের জ্বরটা কমছিলনা অরুণিমা বেশ জোর করেই শহরের সবচেয়ে নাম করা ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলো। অনেক কটা টেস্ট করার পর প্রায় একুশ দিনের মাথায় ধরা পড়ল এক কঠিন অসুখ।

যে অসুখটার নাম শুনলে আজও মানুষ ভয় পায় ছোঁয়াচে ভেবে।

আরুর সেকি কান্না। কত ঠাকুরের কাছে মানত করে ফেললো। কোন কোন বারে কোন কোন ঠাকুরের উপোস করলে সম্বিতের মঙ্গল হবে সেই নেশায় মেতে উঠলো কুসংস্কার বিহীন মেয়েটা।

ডাক্তারের কাছে চুপিচুপি গিয়ে সম্বিত জিজ্ঞেস করেছিল, “টিউবারকলোসিস রোগটা কি সত্যিই ছোঁয়াচে?

না, আপনার ক্ষেত্রে সেরকম ব্যাপার নয় তবুও যতটা পারবেন নিজেকে একটু আলাদা রাখবেন। তবে গ্ল্যান্ডের ফোলাটা ওষুধে না কমলে কেটে বাদ দেবার কথা ভাববো।”

সবটাই আরুর কাছে এসে বলেছিল সম্বিত। এই অসুখটা হবার পর আরো যেন বেশি করে অরুণিমাকে আঁকড়ে ধরেছিল ও।

এক কফিকাপে চুমুক দিতে বা এক প্লেট থেকে খাবার ভাগ করে খেতে আরু একটুকু দ্বিধাবোধ করেনি। কারণ সে মেনেই নিয়েছিল সম্বিত তার একান্ত আপন মানুষ।

এক বছর টানা ওষুধের পর সম্বিত সুস্থ জীবনে ফিরে এসেছিল আর অরুণিমার বদ্ধমূল ধারণা ছিল তার মানতের জোরেই কাটাছেঁড়া না করেই সম্বিত সুস্থ হয়ে গেছে।

(৪)

তারপর বছর দুয়েক কেটে গেছে। আরু এখন ভগবান নামক বস্তুটার থেকে দশ হাত দূরে থাকে কারণ সে জানেইনা কেন সম্বিত হঠাৎ তাকে একদিন বলে গেলো, “তুই আমাকে আপন করতে পারলি না। ভালোবাসা মানে স্যাক্রিফাইস। আর তোর মধ্যে ঠিক ওই জিনিসটারই অভাব। আমি তোর সাথে ভাল থাকতে পারব না।”

অরুণিমা সেদিন হতবাক হয়ে সম্বিতের  চলে যাওয়াটা দেখেছিল।

কি কারণে সম্বিত তাকে ছেড়ে গেছে তার উত্তর আরু খুঁজে পায়নি সেদিন।

ভেবেছিল জীবনের সব উত্তর মেলে না।

সেদিন সোমার ফোনে সে সব উত্তর পেয়ে গেছে।

ভোরের আলো ফুটে আসছে।

আজ স্নান করে গীর্জায় যাবে অরুণিমা।

ঘড়িতে আটটা পাঁচ। আজ ১২ই ফেব্রুয়ারি। আমাদের ফেরার দিন। কর্তামশাই তাড়া দিচ্ছে।সব গোছগাছ করে নিচে নেমে এলাম।

গাড়িতে বসে একবার টেরেসের দিকে তাকালাম। মিষ্টি মেয়েটা হাত নাড়ছে। অদ্ভুত মায়া জড়ানো মুখটা। গতকাল সারারাত ওর কথাই ভেবেছি।

“একটু আসছি” বলে নেমে  পড়লাম গাড়ি থেকে। আড়চোখে দেখলাম কর্তার বিরক্তি ভাব।

লাভার বাজার থেকে কেনা ছোট বৌদ্ধ মূর্তিটা ওর হাতে দিয়ে বললাম “ভালো থেকো।”

আমাদের গাড়িটা ছেড়ে দিল।

আর অরুণিমা হাঁটতে লাগলো ধীর পায়ে। পেছন ফিরে দেখলাম মেয়েটা সেই গীর্জার রাস্তা ধরে হাঁটছে।

হাতে সেই ফোল্ডিং ছাতা।

মনে মনে ঈশ্বরকে বললাম, আজ আর অসময়ে যেন বৃষ্টি না আসে।

Author

Du-কলম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!