ডঃ দীপ্র ভট্টাচার্য
২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি পূর্ণ হলো The Phantom–এর ৯০ বছর। কমিক স্ট্রিপের পাতায় জন্ম নেওয়া এই মুখোশধারী নায়ক শুধু একটি চরিত্র নয়; তিনি আধুনিক সুপারহিরো-ধারণার অন্যতম অগ্রদূত, এক উত্তরাধিকারভিত্তিক মিথ, এবং বিশ্বজুড়ে বহু প্রজন্মের পাঠ-স্মৃতির অংশ।
ফ্যান্টমের আত্মপ্রকাশ ১৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৬-এ, আমেরিকার দৈনিক সংবাদপত্রের কমিক স্ট্রিপ হিসেবে। স্রষ্টা Lee Falk—যিনি পরে আরেক জনপ্রিয় চরিত্র Mandrake the Magician-এরও জনক। ১৯৩০-এর দশকে কমিক স্ট্রিপ ছিল সংবাদপত্রের বিক্রি বাড়ানোর বড় মাধ্যম। সেই প্রেক্ষাপটে লী-ফক এমন এক নায়ক কল্পনা করলেন, যিনি রহস্যময়, মুখোশধারী, শারীরিকভাবে সক্ষম, কিন্তু অতিমানব নন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো—ফ্যান্টমের আবির্ভাব সুপারম্যানেরও আগে। Superman প্রথম প্রকাশিত হন ১৯৩৮ সালে, আর Batman ১৯৩৯-এ। অর্থাৎ স্কিন-টাইট কস্টিউম, মুখোশ, গোপন আস্তানা—এসব উপাদান জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে ফ্যান্টম পথিকৃৎ।
ফ্যান্টমকে ডাকা হয় “The Ghost Who Walks” এবং “The Man Who Cannot Die” নামে। গল্পের ভিত ১৫৩৬ সাল। এক ব্রিটিশ নাবিকের ছেলে জলদস্যুদের হাতে পিতৃহত্যা প্রত্যক্ষ করে শপথ নেন—তিনি ও তার বংশধরেরা চিরকাল দস্যুতা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়বেন। তিনিই প্রথম ফ্যান্টম। তাঁর বংশের ২১তম উত্তরপুরুষ হলেন, বর্তমান ফ্যান্টম। প্রত্যেক ফ্যান্টমের নামই হলো, ক্রিস্টোফার (কিট) ওয়াকার। যদিও লী-ফকের লেখা থেকেই জানা যায়, এই বংশের প্রকৃত পদবী ছিল, “স্ট্যান্ডিশ”।
এরপর থেকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম একই পোশাক ও পরিচয় ধারণ করেছে। বাইরের দুনিয়া ভাবে—সে অমর। বাস্তবে এটি এক বংশানুক্রমিক দায়িত্ব। এই উত্তরাধিকার-ধারণা কমিক জগতে অত্যন্ত অভিনব ছিল এবং পরবর্তী বহু ন্যারেটিভ কাঠামোয় প্রভাব ফেলেছে।
ফ্যান্টমের কার্যক্ষেত্র আফ্রিকার কাল্পনিক দেশ “বাঙ্গালা”। এখানে রয়েছে তার বিখ্যাত ‘স্কাল কেভ’—খুলির আকারের গুহা, যা তার পূর্বপুরুষদের স্মৃতিচিহ্নে পূর্ণ। তার বিশ্বস্ত ঘোড়া হিরো এবং নেকড়ে ডেভিল—দু’জনেই নিয়মিত সঙ্গী।
এই জঙ্গলভিত্তিক সেটিং তাকে শহুরে সুপারহিরোদের থেকে আলাদা করেছে। তার লড়াই মূলত জলদস্যু, দাসব্যবসায়ী, ধনরত্ন ও অস্ত্রপাচারকারী ও স্বৈরশাসকদের বিরুদ্ধে। যদিও ফুটমকাহিনীতে মারামারির অপরিহার্যই বলা চলে, কিন্তু বেশ কিছু অনেক কাহিনীতে খুব বেশী বা কোনোওরকম হিংসাত্মক কর্মে লিপ্ত না হয়ে শুধুমাত্র মানবিকতার প্রতিভূ হয়েও উঠতে দেখা গেছে ফ্যান্টমকে।
ফ্যান্টমের পোশাক বেগুনী—যা কমিক ইতিহাসে একটি স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করেছে। যদিও ফক-সাহেব প্রথমে তাকে ধূসর পোশাকে ভেবেছিলেন, নামও দিয়ে ফেলেছিলেন “The Grey Ghost”, কিন্তু পরবর্তীকালে রঙিনে মুদ্রণের সময়ে নিতান্তই ভুলক্রমে ফ্যান্টমের পোশাক বেগুনী রঙের হয়ে যায় এবং তখন থেকেই “Purple” রঙের ফ্যান্টম জনপ্রত্যতার শীর্ষে উন্নীত হয়। তার মুখোশে চোখ দৃশ্যমান নয়, ফলে অভিব্যক্তি সীমিত, কিন্তু রহস্য গভীর।
তার দুটি আংটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। একটির খুলিচিহ্ন শত্রুর গালে চিরস্থায়ী দাগ ফেলে—যা ন্যায়বিচারের প্রতীকী সীলমোহর। অন্যটি বন্ধুদের সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দেয়। খুলির চিহ্নটি এতটাই আইকনিক যে এটি বিশ্বব্যাপী কমিক প্রতীকের অংশ হয়ে গেছে। প্রথম আংটিটি প্রথম ফ্যান্টম থেকে ব্যবহৃত হয়ে এলো, দ্বিতীয়টির সূত্রপাত হয়, ষষ্ঠ ফ্যান্টমের সময় থেকে।
প্রথম দিকের স্ট্রিপে চিত্রাঙ্কন করেছিলেন রে মুর। পরবর্তীতে উইলসন ম্যাককয়, সাই ব্যারি প্রমুখ শিল্পী ফ্যান্টমকে নতুন ভ্যিজুয়াল ভাষা দেন। বিশেষত সাই ব্যারির আঁকা (১৯৬০–৯০ দশক) অনেক পাঠকের কাছে ক্লাসিক ফ্যান্টম-লুক হিসেবে বিবেচিত।
গল্পের টোনও সময়ের সঙ্গে বদলেছে—প্রথমদিকে সরল অ্যাডভেঞ্চার, পরে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, আন্তর্জাতিক অপরাধচক্র, এমনকি মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েনও যুক্ত হয়েছে।
ফ্যান্টম শতাধিক দেশে প্রকাশিত হয়েছে। স্ক্যান্ডিনেভিয়ায় “Team Fantomen” গোষ্ঠীর নিজস্ব ম্যাগাজিন “Fantomen” ১৯৬০-এর দশক থেকে নিয়মিত বেরিয়ে চলেছে। এই কাহিনীগুলির একটি বৈশিষ্ট্য হলো, বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন লেখক ও চিত্রশিল্পীদের দ্বারা বর্তমান তথা ২১তম ফ্যান্টম ছাড়াও পূর্ববর্তী ২০ জন ফ্যান্টমের বিভিন্ন অভিযানের কথাও আমরা জানতে পারি – যা লী-ফক রচিত কাহিনীগুলিতে সেভাবে পাওয়া যায় না। এই কাহিনীগুলিতে মধ্য-আধুনিক যুগ থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত সময়কালের মধ্যে আফ্রিকা, ইউরোপ, আমেরিকা ও এশিয়ার প্রচুর ঐতিহাসিক ঘটনা ও বিখ্যাত ব্যক্তিত্বদের অবতারণা করা হয়েছে – যুগে যুগে ফ্যান্টমরা যেন সেগুলির প্রত্যক্ষ সাক্ষী। অস্ট্রেলিয়াতেও দীর্ঘদিন ধরে “Frew Publication” নামে আলাদা প্রকাশনা চলেছে, যারা লী-ফক রচিত কাহিনীগুলির সঙ্গে “Team Fantomen”এর কাহিনীগুলিও ইংরাজী ভাষায় প্রকাশ করে থাকে।
ভারতীয় উপমহাদেশে ফ্যান্টমের জনপ্রিয়তা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ইন্দ্রজাল কমিকস ১৯৬৪ সালের মার্চ মাস থেকে ইংরাজী ও হিন্দি ভাষায় এবং ১৯৬৬ সালের জানুয়ারী মাস থেকে বাংলা ভাষায় ফ্যান্টম প্রকাশ করেছিলো। ১৯৯০ সালের এপ্রিল মাসে আচমকাই প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যাওয়া পর্যন্ত এই তিনটি ভাষা সহ ভারতে প্রচলিত বিভিন্ন ভাষায় সেগুলি প্রকাশিত হয়েছিলো। অনেক ভারতীয় পাঠকের কাছেই ফ্যান্টমই ছিল প্রথম বিদেশি কমিক-নায়ক। বাংলা ভাষায় সর্বপ্রথম ফ্যান্টম কমিকসের আবির্ভাব হয়, আনন্দবাজার পত্রিকায়। ১৯৫৮ সালের ১৩ই জানুয়ারী থেকে যা আজও নিয়মিত প্রকাশ হয়ে চলছে। ২১তম ফ্যান্টমের সুন্দরী বিদুষী স্ত্রী ও দুই যমজ সন্তান কিট (ভাবী ২২তম ফ্যান্টম) ও হেলোয়েজ এককথায় বাঙালির ঘরের লোক।
১৯৯৬ সালে মুক্তি পায় হলিউড ছবি The Phantom, যেখানে মুখ্য ভূমিকায় ছিলেন Billy Zane। বক্স অফিসে বিশাল সাফল্য না পেলেও ছবিটি কাল্ট মর্যাদা অর্জন করে। রেডিও সিরিজ, অ্যানিমেটেড রূপান্তর, উপন্যাস—বিভিন্ন মাধ্যমে চরিত্রটি টিকে আছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডিজিটাল কমিক ও রি-ইস্যুর মাধ্যমে নতুন পাঠকের কাছেও পৌঁছাচ্ছে।
ফ্যান্টমের কোনও অতিমানবীয় শক্তি নেই। তিনি উড়তে পারেন না। তার শক্তি শারীরিক সক্ষমতা, প্রশিক্ষণ, কৌশল ও মানসিক দৃঢ়তা। তার সঙ্গিনী ডায়ানা পামার শিক্ষিত ও স্বাধীনচেতা চরিত্র—যা সময়ের তুলনায় প্রগতিশীল উপস্থাপনা। পরিবার, সন্তান—এসব উপাদানও গল্পে যুক্ত হয়েছে, যা তাকে অনেক সুপারহিরোর তুলনায় বেশি মানবিক করে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জন্ম নেওয়া এক কমিক স্ট্রিপ চরিত্র ৯০ বছর টিকে থাকা নিজেই এক ঐতিহাসিক ঘটনা। মিডিয়া বদলেছে—সংবাদপত্র থেকে টিভি, টিভি থেকে ইন্টারনেট। কিন্তু ফ্যান্টমের মূল দর্শন বদলায়নি: অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবিচল অবস্থান।
ফ্যান্টম আসলে এক ব্যক্তি নয়—এক আদর্শ। মুখ বদলায়, মানুষ বদলায়, কিন্তু শপথ অটুট থাকে। ৯০ বছর পরেও তাই ফ্যান্টম শুধু কমিক চরিত্র নয়; তিনি উত্তরাধিকার, ন্যায়বোধ এবং সাংস্কৃতিক স্মৃতির এক জীবন্ত প্রতীক।

অসাধারণ লাগলো। “ফ্যান্টম”, “বেতাল”, “অরণ্যদেব”…সত্যিই এক প্রাতঃস্মরণীয় চরিত্র। সমগ্র মানবজগতের অনুপ্রেরণা হওয়া উচিত ফ্যান্টম।