শিল্পী : মহুয়া বসু
সখী, হে! হামারি দুখের নাহি ওর…”— বৈষ্ণব পদাবলীর এই বিরহময় আকুলতার মধ্যেই যেন লুকিয়ে আছে শ্রীকৃষ্ণকে পাওয়ার চিরন্তন ব্যাকুলতা। আবার অন্যদিকে, যশোদার কোলে ননীচোরা যাঁর দুষ্টুমিতে বৃন্দাবনের প্রতিটি ঘর ভরে ওঠে হাসি ও আনন্দে। একই কৃষ্ণ কখনও মায়ের আদরের গোপাল কখনও গোপীদের প্রাণের কানাই, আবার কখনও রাধার হৃদয়ের শ্যাম। এই বহুরূপী কৃষ্ণভাবনাই জন্মাষ্টমীকে করে তুলেছে হৃদয়ের এক গভীর আনন্দোৎসব।
জন্মাষ্টমীর রাতে যখন মন্দিরে শঙ্খধ্বনি ওঠে, ঘণ্টা বাজে, “হরে কৃষ্ণ” নামসংকীর্তনে চারদিক মুখরিত হয়, তখন বালগোপালের জন্মলীলার সঙ্গে যেন বৃন্দাবনের রাধাকৃষ্ণ-লীলা একসূত্রে মিলিত হয়। বাল গোপালের আরাধনার সময়ে যদি চোখে ভেসে ওঠে যে কৃষ্ণ যশোদার কোলে হাসছে, কোথাও ননী চুরি করে পালাচ্ছে, সঙ্গে সঙ্গে মনে হয় কোথাও যেন তাঁর বাঁশির সুরে রাধার হৃদয় ব্যাকুল হয়ে উঠছে।
বৈষ্ণব পদাবলীর কবিরা কৃষ্ণের এই মধুর রূপকে নানা ভাবে তুলে ধরেছেন। চণ্ডীদাসের পদে কৃষ্ণ-রাধার প্রেম যেমন মানবিক আবেগে স্পন্দিত, তেমনই তার অন্তরালে রয়েছে গভীর আধ্যাত্মিকতা। রাধার কৃষ্ণ-অনুরাগ আসলে পরমের প্রতি জীবাত্মার আকুলতার প্রতীক। রাধা যতই কৃষ্ণের কাছে যেতে চান, বিরহ ততই তাঁকে ব্যাকুল করে তোলে। তাই বৈষ্ণব কবির কণ্ঠে রাধার হৃদয় যেন বলে ওঠে—কৃষ্ণকে ছাড়া এই জীবন অর্থহীন।
বিদ্যাপতির পদাবলীতে রাধাকৃষ্ণের প্রেম পেয়েছে আরও কোমল ও নিবিড় রূপ। তাঁর প্রেমের ভাষায় কখনও লজ্জা, কখনও অভিমান, কখনও মিলনের আনন্দ, আবার কখনও বিচ্ছেদের অসহনীয় যন্ত্রণা। জ্ঞানদাস ও গোবিন্দদাসের পদেও রাধার বিরহ ও কৃষ্ণপ্রেম একইভাবে হৃদয়কে স্পর্শ করে। “রূপ লাগি আঁখি ঝুরে, গুণে মন ভোর”—এই ধরনের পদভাব আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে কৃষ্ণের সৌন্দর্য শুধু চোখকে মুগ্ধ করে না, তাঁর গুণ ও প্রেম হৃদয়কেও পূর্ণ করে।
কৃষ্ণের বাঁশির সুর তাই কেবল বৃন্দাবনের গোপীদের আহ্বান নয়; তা যেন মানুষের অন্তরের চিরন্তন ডাক। যমুনার তীরে কদমতলে রাধা যখন বাঁশির সুর শুনে ছুটে যান, তখন সেই ছুটে চলার মধ্যে রয়েছে সমস্ত বন্ধন অতিক্রম করে প্রিয়তমের কাছে পৌঁছানোর আকাঙ্ক্ষা। রাধা-কৃষ্ণের প্রেম তাই পার্থিব প্রেমের সীমা ছাড়িয়ে হয়ে ওঠে ভক্তির এক অনুপম সাধনা।
এই কারণেই জন্মাষ্টমী শুধু কৃষ্ণের জন্মদিন নয়; এটি প্রেমের জন্মদিন, ভক্তির জন্মদিন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের জাগরণের দিন। বৈষ্ণব পদকর্তাদের রাধাকৃষ্ণ-ভাবনা এবং বালগোপালের মধুর লীলা আমাদের শেখায়—ঈশ্বরকে পাওয়ার জন্য প্রয়োজন নির্মল হৃদয়, গভীর ভালোবাসা এবং একনিষ্ঠ ভক্তি।
জন্মাষ্টমীর পুণ্যতিথিতে, দূর হোক অন্ধকার, কৃষ্ণ প্রেমের চিরন্তন সুরে জেগে উঠুক মানবতা, শান্তি ও ভালোবাসার পৃথিবী।
