Home ভ্রমণ, প্রবন্ধ আমার ভ্রমণ বৃত্তান্ত – ৪৬
ভ্রমণপ্রবন্ধ

আমার ভ্রমণ বৃত্তান্ত – ৪৬

 

 

গোপা মিত্র

গঙ্গা যমুনার উৎস সন্ধানে

 

 

“নদি, তুমি কোথা হইতে আসিয়াছো?”

“মহাদেবের জটা হইতে।”

অনেকদিন আগে স্কুলজীবনে বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসু রচিত “ভাগিরথীর উৎস সন্ধানে” পড়েছিলাম। তার বহু বচ্ছর পর এক গ্রীষ্মে চারধাম যাত্রার সুযোগ পেয়ে আমি চলেছি সেই মহাদেবের জটার খোঁজে, ভাগিরথীর উৎস সন্ধানে – গঙ্গোত্রী।

জানি না কথাগুলো মনের কোন গভীরে ঘুমিয়েছিলো। আজ যখন গঙ্গোত্রীর পথে, তখন যেন তারা জেগে উঠে আমাকেও জাগিয়ে দিলো – মনে হলো তারা যেন বলছে অনেকদিন তো হলো, এবার অন্ততঃ এ কথাগুলোর সত্যতা খুঁজে বার করো।

ভাগিরথী তথা গঙ্গা আমাদের মাতৃসমা, আমাদের ধারক ও বাহক। পুরাণমতে, সগর রাজার ষাটহাজার পুত্র কপিলমুনির কোপে ভস্ম হয়ে যায়। রাজা সগরের হয়ে তাঁর পৌত্র অংশুমান কপিলমুনির কাছে ক্ষমাপ্রার্থণা করলে, মুনি বলেন যে, একমাত্র গঙ্গা নদীর স্পর্শেই সগর রাজার পুত্রদের ভস্মমুক্তি ঘটবে। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য সেই সময়ে গঙ্গা শুধুমাত্র স্বর্গে প্রবাহিত হতেন।

অংশুমান ও তাঁর পুত্র দিলীপ অনেক চেষ্টা করেও বিফল হওয়ার পরে দিলীপের পুত্র ভগীরথ প্রতিজ্ঞা করেন যে, গঙ্গাকে মর্ত্যে আনয়ন করে পূর্বপুরুষদের শাপমুক্তি না ঘটিয়ে তিনি সিংহাসনে বসবেন না। কিন্তু গঙ্গা স্বর্গে প্রবহমান। ভগীরথের ডাকে তিনি মর্ত্যে আসবেন কেন? তখন ভগীরথ ব্রহ্মার আরাধনা করে তাঁকে তুষ্ট করলেন। ব্রহ্মার আদেশে গঙ্গা মর্ত্যে আসতে রাজী হলেন। কিন্তু একটা সমস্যা থেকেই গেলো। গঙ্গার প্রবল বেগে তো সৃষ্টি ধ্বংস হয়ে যাবে। সেই বেগ ধারণ করবে কে? এবার ভগীরথ শিবের শরণাপন্ন হলেন ও তাঁর তপস্যা করে তাঁকেও তুষ্ট করলেন। শিব রাজী হলেন নিজের জটায় গঙ্গাকে ধারণ করতে। স্থির হলো, ভগীরথের পিছে পিছে শিব আসবেন জটায় বদ্ধ গঙ্গাকে নিয়ে এবং আসতে আসতেই অল্প অল্প করে জটা আলগা করবেন, আর গঙ্গাও মুক্ত হবেন। এভাবেই কতো না শহর, নগর, বনানী, শস্যক্ষেতের মধ্যে দিয়ে বয়ে চলে গঙ্গা বিলীন হলেন সাগরে। তাঁর পবিত্র স্পর্শেই শাপমুক্ত হলেন সগর রাজার পুত্রগণ। ভগীরথ গঙ্গাকে মর্ত্যে আনয়ন করেছিলেন বলে গঙ্গার আর এক নাম হলো ভাগিরথী।

এবার আমরা গঙ্গোত্রীর পথে। বদ্রীনাথ থেকে পাকদন্ডী পথে গঙ্গোত্রীর দূরত্ব ৪৩০ কিলোমিটার। সেই পর্বতের পর পর্বত বেষ্টন করে, মাঝেমধ্যে হেয়ার-পিন বাঁক পার হয়ে, দু’পাশের নয়নাভিরাম দৃশ্যের মাঝ দিয়ে স্বর্গের আর এক নদী অলকানন্দাকে সঙ্গী করে আমাদের বাস এগিয়ে চলেছে। রুদ্রপ্রয়াগে এসে আমরা তার সঙ্গ ছাড়লাম। সামান্যক্ষণের জন্য হলেও, পেলাম মন্দাকিনীকে। মন্দাকিনী পার হয়ে আরোও কিছু পথ এসে পৌঁছে গেলাম ‘টেহরী’ – এবার আমাদের সঙ্গী ভাগিরথী গঙ্গা। আজ এখানেই আমাদের রাতের বিশ্রাম।

পরদিন প্রাতে আবার আমাদের যাত্রা শুরু। ধরাসু অতিক্রম করে পেরিয়ে এলাম হরসিল, লঙ্কা, ভৈরোঁঘাটি। আমাদের সঙ্গে সঙ্গেই কিন্তু চলেছে ভাগিরথী গঙ্গা। হরসিলের পরই অবশ্য হিমালয়ের রুক্ষরূপ। জায়গায় জায়গায় পাহাড় অসম্ভব ভাঙাচোরা। পথের আর একপাশে অনেক নিচে গা ছমছম করা গিরিখাতের মধ্যে দিয়ে বয়ে চলেছে সরু রূপোলী ফিতের মতো গঙ্গা। সবুজের কোনোও চিহ্নই নেই কোথাও।

বর্তমানে উত্তরাখণ্ড রাজ্যের উত্তরকাশী জেলায় ১০,২০০ ফুট উচ্চতায় গঙ্গোত্রী। এখানেই আমাদের বাসযাত্রার ইতি। কলকাতার যে নামী নির্ভরযোগ্য পর্যটক সংস্থার সঙ্গে আমরা চলেছি, তারা আমাদের থাকবার ব্যবস্থা করেছে গঙ্গার তীরে অবস্থিত ‘গঙ্গা নিকেতন’-এ। দোতলায় আমাদের ঘর – সামনেই প্রশস্ত এক রেলিংবিহীন ‘বারান্দা’। অনায়াসেই সেখানে চেয়ার পেতে বসা যায়। নিচ দিয়েই ভয়ঙ্কর গর্জনরতা গঙ্গা দুরন্ত দুর্বার গতিতে বয়ে চলেছে উপলবন্ধুর পথে।

ব্যাস্‌! আমার আর কিছুই চাই না – বুঝে গেছি, সারাদিন এখানে বসেই আমার কেটে যাবে।

সামনেই বয়ে চলেছে গঙ্গা। একবার স্নান করবো না? সিঁড়ি দিয়ে নেমে একটু হেঁটেই একেবারে গঙ্গার পাশে। সাঁতার জানি না বলে, জলে আমার ভীষণ ভয়। তার ওপরে, মে মাসের গরমেও উচ্চতার কারণে এখানে ঠাণ্ডা প্রচণ্ড।  কিন্তু গঙ্গার জল তুলে মাথায় তো ঢালতে পারবো – এই ভেবে পর্যটন সংস্থার রান্নাঘর থেকে একটা জল তোলার মতো পাত্র চেয়ে নিলাম।

গঙ্গার ধারে এসে দেখলাম, দু’একজন স্থানীয় মহিলা একেবারে পাড়ের ধারে দাঁড়িয়ে জলে ডুব দিচ্ছে। তাদের দেখে আমারও সাহস বেড়ে গেল। হাত দিয়ে দেখলাম জল একেবারে বরফ ঠাণ্ডা। কিন্তু ওরা পারলে, আমিই বা পারবো না কেন? তাছাড়া আমি তো আর ওদের মতো জলে নামছি না। আমি শুধু পাড়ে দাঁড়িয়ে মাথায় জল ঢালবো।

আমার সঙ্গীরা আমকে অনেক বারণ করলো – কিন্তু পুণ্যলোভাতুরা আমি তাদের কথা শুনলাম না। এক পাত্র জল তুলে মাথায় ঢেলে দিলাম – সঙ্গে সঙ্গেই সারা শরীরে বিদ্যুৎ-তরঙ্গ – মনে হলো কেউ যেন একটা বরফের ছুরি চালিয়ে আমার মাথাটাকে কেটে দু-আধখানা করে দিলো।

আর নয়, খুব হয়েছে – আর আমার পুণ্যের দরকার নেই! ফিরে চললাম আমাদের আস্তানায়।

এবার চললাম গঙ্গামায়ের মন্দির দর্শনে। পথে নেমেই চোখে পড়লো সোনালী ‘সুদর্শন শৃঙ্গ’, যেন গঙ্গোত্রীর মাথার মুকুট। মন্দির একেবারেই কাছে। বৃহত্তর হিমালয়ের পটভূমিকায়, প্রায় পাশ দিয়েই বয়ে চলা ভাগিরথী তীরবর্তী মন্দিরটি অমলিন, সাদা পাথরের তৈরী। এমন শান্ত, নির্জন প্রাকৃতিক পরিবেশই মনে হয়ে এই পবিত্র মন্দিরের উপযুক্ত স্থান। এখানে এলে মন আপনা থেকেই দেবতার দিকে ধেয়ে যায়।

সামনে কয়েকধাপ সিঁড়ি উঠে মন্দিরের প্রবেশদ্বার। গর্ভগৃহে গঙ্গামায়ের মূর্তি। এছাড়াও রয়েছে লক্ষ্মী, যমুনা, সরস্বতী ও ভগীরথের মূর্তি। পাশেই রয়েছে কয়েকটি ছোট ছোট দোকান। ভক্তগণ সেখান থেকেই পূজা উপচার সংগ্রহ করে প্রবেশপথের ঘন্টা বাজিয়ে ভিতরে প্রবেশ করে ও পূজা দেয়। দীওয়ালির দিন এই মন্দির বন্ধ হয়ে যায় ও অক্ষয় তৃতীয়ার দিন, এই মন্দিরের পূজা পুনরায় শুরু হয়। বন্ধের সময় মূর্তি থাকে হরসিলের কাছে ‘মুখবা’ গ্রামে – এবং সেখানেই সেমওয়াল পরিবারের পূজারীরা গঙ্গাপূজা সম্পন্ন করেন।

মূর্তিদর্শন করে আমরা ফিরে চললাম। সন্ধ্যায় আবার একবার এলাম আরতি দর্শনে। রাতের নিস্তব্ধ প্রকৃতির পরিপ্রেক্ষিতে মন্দিরের ঘন্টাধ্বনি মুগ্ধ আমাদের যেন দেবতার চরণেই পৌঁছে দিলো।

এখানে একটা কথা মনে রাখতে হবে যে, গঙ্গোত্রীর সব আলোই জ্বলতো সৌর বিদ্যুতে। আমাদের বলে দেওয়া হয়েছিলো যে, এখানে সন্ধ্যা ছ’টায় আলো জ্বলবে আর রাত ন’টায় আলো নিভে যাবে। তার মধ্যেই আমাদের খাওয়াদাওয়া সব সেরে নিতে হবে। রাতে কোনোও দরকার পড়লে আমাদের টর্চের আলোতেই কাজ সারতে হবে।

পর্যটন সংস্থা পরদিন আমাদের সময় দিয়েছে গোমুখ যাওয়ার জন্যে। বয়স, শক্তি, সামর্থ্য ইত্যাদি বিবেচনা করে তারাই স্থির করে দিয়েছে যে, কে যেতে পারবে আর কে নয়। আমরা তিনজনে – আমি, কল্যাণ আর মেয়ে সোনাই – “যেতে পারবে”-র দলে পড়েছি। আমি খুব খুশী, কিন্তু একটু পরেই খুশী উধাও। মেয়ে বেঁকে বসেছে, সে যাবে না। এখানে বাকি যারা থেকে যাবে, সেও তাদের সঙ্গে থেকে যাবে। কিন্তু আমরা সেটা চাই না। সোনাইকে না নিয়ে আমারাও যাবো না। অনেক বুঝিয়েও তাকে কিছুতেই রাজী করানো গেলো না। মন খারাপ নিয়েই শুয়ে পড়লাম।

পরদিন ভোরে উঠেই মন ভালো হয়ে গেলো। সোনাই বলছে যে, সে আমাদের সঙ্গে যেতে রাজী। আহা – কি আনন্দ! আমরা তিনজনে একসঙ্গে যাবো ভাগিরথীর উৎস সন্ধানে – গোমুখ বা গৌমুখ।

তৈরী হয়ে আমরা বার হলাম। সন্ধ্যের মধ্যেই ফিরতে হবে। কতো দূর, রাস্তা কেমন – আমাদের কারোরই কোনোও ধারণা নেই। তাই আমরা কোনোও ঝুঁকি নিলাম না। সকলেই ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হলাম। আমাদের সকলের সঙ্গেই রইলো কেদারনাথ থেকে কেনা লাঠি। আপাততঃ আমারা সকলে ঘোড়ার পিঠে আর লাঠি আমাদের সহিসের হাতে।

আমরা চলেছি প্রায় সাত-আটজন একসঙ্গে লাইন দিয়ে। কারণ রাস্তা এতোটাই সরু যে, সওয়ারী সমেত একটা ঘোড়াই কোনোওক্রমে যেতে পারে।

আমার ঘোড়া সবার পিছনে। যাওয়ার সময়ে আমার ঠিক বাঁদিকে উঠে গেছে পর্বতের প্রাচীর আর ডানদিকে নেমে যাওয়া অতল খাদের মধ্যে দিয়ে বয়ে চলা গঙ্গা। সামনে তাকিয়ে এগিয়ে চলেছি – খাদের দিকে চাইলেই মাথা ঘুরে যাচ্ছে। মাঝে মাঝেই পর্বতের ধ্বসে ছোট ছোট পাথরের টুকরো গড়িয়ে এসে সামনে পড়ছে। আবার কখনোও কোনোও পাহাড়ী জলধারা নেমে এসে পথ করে তুলছে পিচ্ছিল, বিপজ্জনক। কোনোওরকমে একটা ঘোড়া বা একজন মানুষ যাওয়ার মতোই সরু পায়ে চলা ঝুরো পাথুরে পথ। ঘোড়া একটু ভারসাম্য হারালেই একেবারে পাশের গভীর খাদে তলিয়ে যাবে কয়েক হাজার ফুট নিচে উত্তাল ভাগিরথীর বুকে। বলা যায় প্রাণ হাতে নিয়ে চলা।

এগিয়ে চলেছি এক পর্বত থেকে আর এক পর্বত বেষ্টন করে। সোনাই, কল্যাণকে আর দেখা যাচ্ছে না। মনে একটাই সান্ত্বনা, কল্যাণ রয়েছে সোনাইয়ের সঙ্গে – আমাকে আর মেয়ের জন্যে ভাবতে হবে না। আমি একলা হলেও নিজেকে ঠিক ম্যানেজ করে নিতে পারবো। মাঝে মাঝে ভয়ে ভয়ে খাদের দিকে দেখছি – না, কেউ এখনোও নিচে পড়ে যায়নি।

আমার সঙ্গীরা প্রায় সকলেই আমার সামনে চলেছে। এবার এলো বিপদ। হঠাৎই আমি জিন সমেত অনেকটা নিচে নেমে এসে একেবারে ঘোড়ার পেটের কাছে ঝুলতে লাগলাম। ভাগ্যে ঘোড়ার রেকাবে পা দুটো গলানো ছিলো – তাই খাদে পড়ে যাইনি। সামনেই চলেছে সহিস – তাকে ডাকতেই, সে এসে কোনোওরকমে আমাকে ঠেলে তুলে আবার ঘোড়ার পিঠে সোজা করে বসিয়ে দিলো। আমার সামনের সঙ্গীরা আমার এই অবস্থা দেখলো ঠিকই, কিন্তু তাদেরও কিছু করবার ছিলো না। ওখানে নামবার বা সাহায্য করবার কোনোও প্রশ্নই নেই। তারা এগিয়ে যেতে বাধ্য হলো।

এবার আমি একেবারে একা নির্জন পথে এগিয়ে চলেছি –একজন মাত্র অল্পবয়স্ক সহিসকে সঙ্গী করে। মনে প্রতিজ্ঞা – গোমুখ আমায় পৌঁছতেই হবে। কিছুক্ষণ পরে আবার সেই একই অবস্থা – আমি ঘোড়ার পেটে রেকাবে পা দিয়ে ঝুলছি। আবারো সহিস আমায় ঠেলে তুলে বসিয়ে দিলো। তৃতীয়বারও একই ঘটনা ঘটলো। সহিসকেও কিছু বলতে পারছি না। আপাততঃ তার ওপর ভরসা করা ছাড়া একলা আমার তো আর কোনোও উপায়ও নেই।

কিন্তু চতুর্থবার এমন হতে আর চুপ করে থাকতে পারলাম না – সাহস করে বলেই ফেললাম, “কি ব্যাপার? বারবার এমন হচ্ছে কেন? তোমার ঘোড়ার জিন ঠিক নেই না কি? বারবার ঘুরে যাচ্ছে কেন? নিশ্চয়ই জিন ছেঁড়া আছে।” সহিস এবার আমাকে ধরে ঘোড়া থেকে নামালো। সেই সরু রাস্তায় ব্যালেন্স করে কিভাবে যে নেমেছিলাম, জানি না। নেমে দেখি, যা ভেবেছি, সত্যিই জিনটা এক জায়গায় খানিকটা ছেঁড়া। তখন সহিস তার থলি থেকে একটা বড় সূঁচ আর খানিকটা মোটা সুতো বার করে সেই ছিঁড়ে যাওয়া জিন সেলাই করলো। আমি পাশে দাঁড়িয়ে রইলাম। জিন ঠিক হলে সে আমায় বললো, “আর এমন হবে না, আপনি নিশ্চিন্ত হয়ে উঠে বসুন।”

বুঝলাম, জিন যে ছেঁড়া ছিলো, সেটা সে আগে থেকেই জানতো। তবু সে কোনোও ব্যবস্থা না নিয়েই সওয়ারী তুলেছে – আমাকে এতোদূর নিয়ে এসেছে। মনে যতোই রাগ হোক্‌, আমাকে চুপ করেই থাকতে হলো, কারণ এখন তো সে ছাড়া আমার গতি নেই।

এমনিতেই অনেক দেরী হয়ে গেছে। এতোক্ষণে নিশ্চয়ই আমার সেই সঙ্গীরা, যারা আমাকে ঝুলে যেতে দেখেছে; তারা কল্যাণের কানে, আমি পড়ে যেতে পারি সে খবর তুলে দিয়েছে। আমাকে এখন যতো শীঘ্র সম্ভব কল্যাণের কাছে পৌঁছতেই হবে। মনে সাহস আর নিজের আত্মবিশ্বাসের জোরে এগিয়ে চললাম সেই বিপজ্জনক রাস্তা ধরে – একা। সঙ্গে সেই একজন মাত্র অল্পবয়সী সহিস।

গঙ্গোত্রী থেকে ৯ কিলোমিটার দূরে পড়ে প্রথম চটি ‘চিরবাসা’। এখানে ‘চির’ গাছের আধিক্যের জন্যই এই নাম। এটাই গোমুখ পথের প্রথম হল্ট। এখান থেকেই দেখা পাওয়া গেলো ভাগিরথী এক দুই তিন – শৃঙ্গগুলির। গঙ্গার সঙ্গে এই শৃঙ্গগুলিও এখন থেকে আমার সঙ্গী হবে। চিরবাসার ৩ কিলোমিটার পরে রয়েছে ধ্বসের জন্য কুখ্যাত ‘গিলা পাহাড়’ বা ‘কাঁচা পাহাড়’। ঝুরঝুর করে ছোট ছোট পাথর পড়লো পাহাড়ের ঢাল বেয়ে। শোঁ শোঁ আর্তনাদ করে তীব্রগতিতে বাতাস বয়ে চলেছে সারাক্ষণ ধরে। ঝুরো মাটির পথ, হু হু করে উড়ছে ধুলো। পাহাড়ী ছাগল এলে তো আরোও ভালো – তাদের পায়ের চাপে না জানি গড়িয়ে পড়বে আরোও কতো পাথরের টুকরো। কোনোওরকমে নিজেকে বাঁচিয়ে এগিয়ে চললাম সামনের চটির দিকে।

এখান থেকে ৪ কিলোমিটার দূরে শেষ চটি ‘ভূজবাসা’ – এখানে রয়েছে ভূর্জপত্রের গাছ। প্রাচীনকালে এই ভূর্জপত্রের উপরেই লেখা হতো – বলা হতো ‘পুঁথি’, ‘পোথী’ বা ‘পুস্তিকা’। রাস্তা এবার স্বাভাবিক আগের মতো। এখানে রয়েছে GMVN-এর বাংলো – থাকবার জন্য। এছাড়াও রয়েছে লালবাবার আশ্রম। তারপর আর থাকবার কোনোও ব্যবস্থা নেই।

আমি তখন ভূজবাসায় প্রায় পৌঁছে গেছি – দেখি কল্যাণ আর সোনাই ফিরে আসছে।  আমাকে দেখে ওরা নিশ্চিন্ত হলো, আমায় আর এগোতে বারণও করলো – কিন্তু আমি এতো দূর কষ্ট করে এসে, যতোদূর ওরা গেছে, ততোদূর না গিয়ে ফিরে যাবো কেন? ওদের ওখানেই অপেক্ষা করতে বলে আমি এগিয়ে চললাম যতোদূর ঘোড়া আমায় নিয়ে যাবে, ততোদূর পর্যন্ত।

হঠাৎই দেখি, আমার সামনে পথ অবরুদ্ধ করে দাঁড়িয়ে এক গগনচুম্বী পর্বতমালা – শিবলিং বা শিবলিঙ্গ। ঘোড়া আর যাবে না, এখানেই আমাকে নেমে পড়তে হবে। চারিদিকে হিমালয়ের ধূসর রুক্ষ রূপ। সেই পর্বতমালা, সূর্যকিরণে তার ঝলমলে শিরোদেশ, মনে হলো যেন মহাদেবের মস্তকের উজ্জ্বল চন্দ্র। মানসচক্ষে দেখলাম, মেঘমুক্ত নীল আকাশ হঠাৎই যেন আবৃত হয়ে গেলো কৃষ্ণবর্ণ মেঘের আচ্ছাদনে। চতুর্দিকে ব্যপ্ত মেঘের কৃষ্ণজালিকা – এই কি তবে মহাদেবের জটা? আমি কি তবে স্বর্গের কাছাকাছি পৌঁছে গেছি? আমার সম্মুখে কি এখন জটামুক্ত, চন্দ্রচূড় বিশিষ্ট দেবাদিদেব মহেশ্বরকেই দর্শন করছি? এরপরেই তো ভাগিরথী পর্বতের পাদদেশে গোমুখ বা গৌমুখ। সেখানেই গঙ্গোত্রী হিমবাহ থেকেই তো গঙ্গার উৎপত্তি। এইজন্যই কি তবে মহাদেব এখানে তাঁর জটা উন্মোচিত করে দিয়েছেন উৎসারিত গঙ্গার বেগ ধারণ করবার জন্য? স্কুলজীবনে পড়া সেই কথার সত্যতা – “নদি, তুমি কোথা হইতে আসিয়াছো? মহাদেবের জটা হইতে।” এতোদিন পর যেন আমি হৃদয়ঙ্গম করতে পারলাম।

আমার চিন্তাজাল ছিন্ন হলো সহিসের কথায় – “এবার ফিরে চলুন। আর দেরী করলে বিপদে পড়বেন এখানে যে কোনোও মুহূর্তে আবহাওয়া খারাপ হয়ে যেতে পারে। তখন ফেরা মুশকিল হয়ে যাবে।” এ কথায় আমি আবার বাস্তবে ফিরে এলাম।

গঙ্গোত্রী থেকে ১৮ কিলোমিটার আর ভূজবাসা থেকে সাড়ে ৪ কিলোমিটার দূরে ১৩,২০০ ফুট উঁচু ভাগিরথী পর্বতের পাদদেশে অবস্থিত গোমুখ বা গৌমুখ। অনেকটা গরুর মুখের মতো দেখতে বলে, এই নাম। এর মধ্যেই গঙ্গোত্রী হিমবাহ থেকে উৎসারিত গঙ্গা যাত্রা করে সাগরের উদ্দেশ্যে। তারপর বিলীন হয় সমুদ্র গহ্বরে। আর মাত্র দেড় কিলোমিটার, সামনেই অভ্রংলিহ ভাগিরথী পর্বত – মস্তকোপরি তার তুষারকিরীট, পাদমূল থেকে উৎসারিত গঙ্গা, কিন্তু আমি যেতে পারবো না – আলগা পাথরে পা দিলে বিপদ অবশ্যম্ভাবী। তাই দূর থেকেই প্রণাম জানালাম।

গোমুখের সম্মুখে (আমার সামনেও বটে) বেশ কিছু অঞ্চল আবৃত ছোট বড় আলগা পাথরের বোল্ডারে – এ যেন পাথরের সমুদ্র। এসবের নিচে কোথায় যে বিপদ লুকিয়ে রয়েছে তা আমাদের মতো সাধারণ মানুষ বুঝতেই পারবে না। তাই আর এগোতে শিক্ষিত গাইডের প্রয়োজন। দূর থেকেই যতোটা সম্ভব দৃষ্টি প্রসারিত করে গোমুখ দেখে আস্তে আস্তে ফিরে চললাম সহিসের সঙ্গে – আমার সেই পুরনো পৃথিবীতে অপেক্ষারত স্বামী ও মেয়ের কাছে।

গোমুখের বিশালত্বের কোনোও পরিমাপ হয় না। তার ভয়ঙ্করতা কল্পনায় আসে না। সৌন্দর্যের কোনোও তুলনা হয় না। এক কথায় এর বিশালতা ও ভয়ঙ্কর সৌন্দর্য অনন্য, অতুলনীয়, অকল্পনীয়।

গোমুখ পিছনে ফেলে ভূজবাসায় এসে কল্যাণ আর সোনাইকে পেয়ে গেলাম। ফেরার পথে চিরবাসায় তিনজনেই আমরা নেমে পড়লাম ঘোড়া থেকে। রাস্তা সরু, বিপজ্জনক, মাঝে মাঝে জলধারায় পিচ্ছিল – কিন্তু চড়াই-উৎরাই নেই, প্রায় সমতল। শুধু পর্বতের ধার দিয়ে পাক খেয়ে এগিয়েছে। মনে হলো ঘোড়ার চেয়ে পায়ে হাঁটাই বেশী সুবিধাজনক। অবশ্য খুব সাবধানে পা ফেলতে হবে।

এবার ডানদিকে পর্বতপ্রাচীর, বামদিকে গভীর খাদের মধ্যে বইছে গঙ্গা। আমাদের তিনজনের হাতেই লাঠি। সরু রাস্তার বেশীটাই আমরা খাদের দিকে পিছন করে, যেহেতু দু’পা ফেলার জায়গা এতোটাই কম এবং সোজা হাঁটলেই পাশের খাদের দিকে চোখ চলে যায়, তাই সেদিকে না চেয়ে, পর্বতের গায়ে হাত দিয়ে দিয়ে লাঠি ঠুক্‌ঠুক্‌ করে পাশভাগে আমরা এগিয়ে যেতে লাগলাম। চেষ্টা করলাম পিচ্ছিল জায়গা টপকে পার হয়ে যেতে।

এভাবেই মনের জোরে পথের বাধা অতিক্রম করে আমরা এসে পৌছে গেলাম গঙ্গোত্রী। আমাদের পিছন পিছন সহিসরাও তখন ঘোড়া নিয়ে পৌঁছে গেছে।

জীবনে এমন বিপদসঙ্কুল অথচ রোমাঞ্চকর যাত্রার সুযোগ আর হয়তঃ পাবো না। এমন বিপজ্জনক পথ, নিজের মনোবল আর আত্মশক্তির জোরে জয় করে লক্ষ্যে পৌঁছে, যে আনন্দ আমি পেয়েছি – তাই বা কম কি? এই যাত্রা আমাকে শুধুমাত্র রোমাঞ্চিতই করেনি, জয়ের লক্ষ্যে পৌঁছবার আনন্দও দিয়েছে – যা আমি কোনোওদিনও ভুলবো না। চলার পথে মানুষের জীবনেও তো কখনোও কখনোও এমন বিপদ নেমে আসে, যখন সে হতাশায় ভেঙে পড়ে, হার মেনে বাঁচতেই ভুলে যায়। কিন্তু সে যদি তার আত্মশক্তির বলে বলীয়ান হয়ে সেই বিপদ অতিক্রম করে এগিয়ে যেতে পারে, তাহলে কি তার বাঁচার আনন্দ আবার ফিরে আসে না?

মনে অনেক প্রশ্ন, আমি মনে মনেই তাদের উত্তর খুঁজে চলেছি। মহাদেবের জটার সন্ধান আমি পেয়েছি – ভাগিরথীর উৎসও তো আমি দেখে এসেছি। এখন আমি ভেবে চলেছি – কেন গঙ্গা সমুদ্রেই বিলীন হয়, তবে কি ওখানেই রয়েছে মহাদেবের পদতল? এই জন্যই কি আমরা পার্থিব দেহাবশেষ গঙ্গায় বিসর্জন দিই মহাদেবের চরণে পৌঁছবার জন্য? নিশ্চয়ই তাই – কারণ পর্বতের উত্থান তো কোনোও এক ভূস্তর থেকেই। সমুদ্রের জল রৌদ্রের তেজে বারিকণায় পরিণত হয়ে বায়ুবাহিত হয়ে গিয়ে পৌঁছয় সেই মহাদেবেরই কাছে। সেখানেই আবার হিমকণারূপে সম্মিলিত হয়ে হিমশৈলে পরিণত হয় ও পুণরায় গঙ্গার উৎসে পরিবর্তিত হয়ে মহাদেবের জটায় বদ্ধ হয়। তাই তো গঙ্গার কোনোও লয়-ক্ষয় নেই। সে যেমন আসে মহাদেবের জটা হতে, তেমন ফিরেও যায়, মহাদেবের জটায় – আবার তার যাত্রার সূচনায়।

২০১৩-র হড়পা বানের পরে গঙ্গোত্রী হিমবাহের অনেক অংশেই ফাটল ধরেছিলো। ২০১৬ সালে উত্তরাখণ্ডে অতিবর্ষণের জেরে গোমুখের সামনের অংশ অনেকখানি ভেঙে গেছে। তাছাড়া প্রাকৃতিক কারণেও গোমুখ এখন পিছিয়ে গেছে।

পরদিন যাত্রা যমুনোত্রী। কিন্তু সেদিন সব যাত্রীরা ফিরে এলেও একজন কিন্তু এসে পৌঁছোয়নি। আমাদের দলের ম্যানেজার তাঁকে খুঁজতে গোমুখ অভিমুখে যাত্রা করলেন। তাঁকে না নিয়ে পর্যটন সংস্থা এগিয়ে যাবেই না কেমন করে? শেষপর্যন্ত ভূজবাসায় তাঁকে খুঁজে পেয়ে তিনি তাঁকে সঙ্গে নিয়ে ফিরলেন।

এগিয়ে চললাম যমুনোত্রীর পথে – যমুনা নদীর উৎস সন্ধানে। পাকদণ্ডী পথে গঙ্গোত্রী থেকে যমুনোত্রীর দূরত্ব ২২৭ কিলোমিটার। আমাদের বাস চলেছে পর্বতমালাকে বেষ্টন করে ভাগিরথীকে সঙ্গী করে। আজ রাতের বিরতি উত্তরকাশীতে। পরদিন যাত্রাপথে ধরাসু ছাড়িয়ে এইবার আমাদের বাস যমুনোত্রীর পথ ধরলো। বারকোট ছাড়িয়ে জানকী চটিতে আজকের মতো আমাদের যাত্রা বিরতি। আমাদের থাকবার ব্যবস্থা অরবিন্দ আশ্রমে। ঘর বেশ ভালোই – আরামদায়ক। বিকেলে একবার বার হলাম চারিপাশ ঘুরে দেখতে। পর্বতের পটভূমিতে, বৃক্ষরাজির মধ্যে জানকী চটির নয়ন মনোহর দৃশ্য দেখছি আর হাঁটছি। তারই মাঝে মাঝে চোখে পড়ছে সাজানো গোছানো কোনোও বড় হোটেল বা ধর্মশালা। এদিক সেদিক কিছুক্ষণ বেড়িয়ে সন্ধ্যার আগেই ফিরে এলাম বাসস্থানে।

চারধামের মধ্যে যমুনোত্রী সবচেয়ে দুর্গম। সমস্ত পথটাই প্রায় চড়াই ওঠা। তাই পরদিন সকালে যমুনোত্রী যাত্রা পথে আমরা সকলেই ঘোড়া নিলাম। সঙ্গে অবশ্যই লাঠি রইলো। বৃষ্টি পড়েই চলেছে। আমরা সকলেই ওয়াটারপ্রুফ পরে নিয়েছি। সঙ্গে রয়েছে গ্লুকোজের জল।

যমুনা মায়ের জয়ধ্বনি দিয়ে আমাদের যাত্রা শুরু হলো। পর্যটন সংস্থা আমাদের সময় বেঁধে দিয়েছে – সাড়ে পাঁচটার মধ্যে ফিরে আমাদের সকলকে হনুমান চটি পৌঁছতে বলা হয়েছে। আমাদের জন্য বাস সেখানেই অপেক্ষা করবে। আমাদের সব মালপত্র সংস্থা জানকী চটি থেকেই নিয়ে চলে যাবে।

পাহাড়ী পথ অত্যন্ত সরু এবং খাড়া। তার ওপর আবার বৃষ্টির জলে পিচ্ছিল। এই সরু, পিচ্ছিল পাথুরে পথ দিয়ে একই সঙ্গে ঘোড়া, ডান্ডি, কান্ডি, মানুষজন – উপরে উঠছে আবার নিচেও নামছে। যেখানে পাশাপাশি দুজন যাওয়া যায় না, সেখানে একই সঙ্গে এতো সব উঠছে নামছে। যারা পায়ে হেঁটে উঠছে বা নামছে, তাদেরই হয়েছে মুশকিল। তারা একবার পাহাড়ের ধার ঘেঁষে সরে দাঁড়াচ্ছে আবার ওঠা বা নামা শুরু করছে।

চড়াই পথের বাঁ পাশে রয়েছে গগনচুম্বী পর্বত প্রাচীর আর ডানপাশে অতলস্পর্শী জঙ্গলাকীর্ণ খাদের পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে উদ্দাম উচ্ছ্বল যমুনা নদী। নদীর ওপারে আবার দৃষ্টি আচ্ছন্ন করে রয়েছে পর্বত প্রাচীর। সবুজ ঘাসের মখমলে বা বড় বড় বৃক্ষরাজির জঙ্গলে আবৃত। মাঝে মাঝেই পাশের পর্বতগাত্র থেকে নেমে আসা কোনোও জলধারা পথের মাঝ বরাবর দিয়ে আড়াআড়ি ভাবে গিয়ে পড়ছে অপরদিকের যমুনা নদীতে বা চলনপথের ঢাল বেয়ে গড়িয়ে যাচ্ছে নিচে। মেঘাচ্ছন্ন আকাশ, প্রায়ান্ধকার রাস্তা, কন্‌কনে ঠাণ্ডা হাওয়ার মধ্যে দিয়ে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে আমরা এগিয়ে চলেছি যমুনা নদীর উৎস – যমুনোত্রীতে। রাস্তা মাঝেমধ্যেই প্রায় ৪৫ ডিগ্রী চড়াই হয়ে যাচ্ছে, আমরা প্রাণপণে লাগাম ধরে ঘোড়ার পিঠে বসে থাকতে চেষ্টা করছি। এই পিচ্ছিল পথে ঘোড়া থেকে নামতেও ভয় হচ্ছে – যদি পড়ে যাই!

পথ ক্রমশঃ সংকীর্ণ থেকে সংকীর্ণতর হচ্ছে। পাশের খাদও গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে। মাঝে মাঝে আবার পাশের পর্বত এমনভাবে হেলে রয়েছে যে, মনে হয় মাথায় ছাতা ধরে আছে। সেই খাড়া পথের সংকীর্ণ ছাউনির তলা দিয়ে মাথা নিচু করে, যদি মাথা ঠুকে যায় এই ভয়ে, আমরা এগিয়ে চলেছি – জানি না কোন্‌ মোক্ষলাভের আশায়!

এসে পৌঁছলাম যমুনা মায়ের মন্দিরে – এর পরেই পথ অবরুদ্ধ করে উঠে গেছে এক অভ্রভেদী পর্বত – বান্দরপুছ (উচ্চতা ৪,৪২১ মিটার)। তার নিচের কালিন্দ পাহাড় থেকেই নেমে আসছে সূর্যকন্যা যমুনা। ‘কালিন্দ’ অর্থাৎ সূর্য – এখানেই রয়েছে চম্পাশর হিমবাহ – যমুনা নদীর উৎস। দুর্গম ওই পথে যাওয়া একেবারেই অসম্ভব। তাই যমুনা মায়ের মন্দির রয়েছে পর্বতের পাদদেশে, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১০,৮০৪ ফুট উচ্চতায়, যমুনা নদীর পূর্ব পাড়ে। ভক্তগণ দূর থেকেই যমুনা নদীর উৎস দর্শন করেন ও মায়ের মন্দিরে পুজো দেন।

চারধামের মধ্যে যমুনোত্রীই সবচেয়ে ছোট এবং আধুনিকতাতেও সবচেয়ে পিছিয়ে। বিদ্যুৎ তখনও পৌঁছয়নি – মাত্র গুটিকয় দোকান ও আশ্রম নিয়ে গড়ে উঠেছে যমুনোত্রীর লোকালয়। গর্ভগৃহে রয়েছে মৃত্যুর দেবতা যমরাজের বোন যমুনার কালো পাথরের মূর্তি। সঙ্গে গঙ্গামূর্তিও রয়েছে।

মন্দিরের প্রবেশপথের সিঁড়ির নিচে কয়েকটি পূজা উপচারের দোকান। তার পাশেই রয়েছে উষ্ণকুন্ড। ভক্তগণ উষ্ণকুন্ডের জলে স্নান সেরে মন্দিরে পূজা দেন। কুন্ডের পাশের দিব্যশিলায় পূজা দিয়েই যমুনা মায়ের পূজার বিধি। তিনটি উষ্ণকুন্ডের মধ্যে সূর্যকুন্ডের উত্তাপ সব থেকে বেশী। ভক্তরা পূজারীর দেওয়া চাল কাপড়ে বেঁধে সূর্যকুন্ডের জলে কিছুক্ষণ ডুবিয়ে রেখে সেই চাল সিদ্ধ হলে তা শুকিয়ে নিয়ে প্রসাদ বলে গ্রহণ করে। প্রচলিত ধারণা যমুনোত্রীর যমুনায় স্নান করলে যমলোক দর্শন থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।

বাকি ধামগুলির অন্যান্য মন্দিরের মতো এই মন্দিরও অক্ষয় তৃতীয়ার দিন খোলা হয় ও দেওয়ালীর দিন বন্ধ হয় – বরফের কারণে। জানকী চটির কাছে খারসালি গ্রাম থেকে আসে এই মন্দিরের পূজারীরা।

এবার যমুনোত্রী থেকে ফেরার পালা। আমরা এবার ঘোড়াকে বিদায় দিলাম। মনে বিশ্বাস উৎরাই পথে হাতে লাঠি নিয়ে আস্তে আস্তে নিশ্চয়ই নিচে পৌঁছে যাবো। তখন অনেকদূর নেমে এসেছি। আকাশ তখনও মেঘাচ্ছন্ন। একদিকের পাহাড়ের প্রাচীর ঘেঁষে অন্যদিকের গভীর খাদের দিক থেকে সরে, সরু পথ ধরে, প্রায়ান্ধকার রাস্তায়, লাঠি ঠুক্‌ঠুক্‌ করতে করতে, একজন একজন করে এগিয়ে চলেছি আমরা তিনজন। আর সঙ্গে আরোও এক পরিবারের তিনজন। এমন সময়ে দেখি, আমাদের সামনে সাত-আটজন ভিড় করে দাঁড়িয়ে আমাদের থামতে বলছে। আমাদের সামনে ওরা কারা? আমাদের থামতেই বা বলছে কেন? না থেমে অবশ্য আমাদের উপায়ও ছিল না। কারণ, রাস্তা আটকে ওরা প্রায় আমাদের সামনেই দাঁড়িয়ে। ভাগ্যিস্‌, আমাদের থামিয়েছিলো – সামনেই দেখি রাস্তা নেই, তাদের আর আমাদের মাঝখানে রয়েছে দু-আড়াই ফুটের একটা গর্ত। আমরা অন্যমনস্ক হয়ে আর এক পা এগোলেই গর্ত দিয়ে একেবারে সোজা নিচের খাদে। তারা বললো যে, ডিনামাইট দিয়ে পাহাড় ফাটানো হচ্ছে – রাস্তা তৈরীর জন্য। এদিক দিয়ে আর যাওয়া যাবে না। আমাদের আবার যে পথ দিয়ে এসেছি, সে পথেই ফিরে যেতে হবে – তারপর অন্য পথ ধরে নিচে নামতে হবে। মানে, আবার বিপজ্জনক চড়াই উঠতে হবে।

অসম্ভব! আমরা তখন পথশ্রমে ক্লান্ত – শক্তি শেষ সীমায়। হনুমান চটি থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে। উপরে উঠবো আবার নিচে নামবো, সেটাও যেমন অবাস্তব; এইভাবে নির্দিষ্ট সময়ে হনুমান চটিতে পৌঁছনো – সেটাও তেমনই অসম্ভব। আমরা গর্তের উল্টোদিকের লোকেদের অনুরোধ করলাম, তারা যদি গর্ত পার হতে আমাদের একটু সাহায্য করে। আমরা নিশ্চয়ই পারবো। ওনারা রাজী হলেন। প্রথমে কল্যাণ তার হাত বাড়িয়ে দিলো। ওরা গর্তের ওপার থেকে তার হাত ধরে টেনে নিলো। কল্যাণের লম্বা পা একেবারেই ওকে ওদিকে পৌঁছে দিলো। এবার আমাদের মেয়ে সোনাই – সেও বেশ লম্বা। বাবার দেখাদেখি সেও একইভাবে ওপারে পৌঁছে গেলো।

এবার আমার পালা। আমি ওদের মতো লম্বা নই। আমার পক্ষে গর্তের ওদিকে পা বাড়িয়ে দিয়ে যাওয়াও সম্ভব নয়। আমি এখন কি করবো? ওদিকে সবাই হাত বাড়িয়ে আছে। মনে মনে নিজেকে বললাম, যেভাবেই হোক্‌ আমাকে পারতেই হবে, নচেৎ আমার জন্য সবাই বিপদে পড়বে। সেই সরু পথের ওপর বিপজ্জনকভাবে গর্তে পা ঝুলিয়ে স্রেফ বসে পড়লাম। পা দুটো গর্তের ওপারে ঠেসিয়ে দিয়ে তাদের দিকে আমার হাত বাড়িয়ে দিলাম। তারা আমাকে প্রায় টেনে নিলো। আমি হুমড়ি খেয়ে গর্তের ওপারে এসে পড়লাম। যাক্‌ নিশ্চিন্ত! আর ভয় নেই।  আমরা এবার আস্তে আস্তে লাঠি ঠুকঠুক করতে করতে পৌঁছে গেলাম হনুমান চটিতে।

হনুমান গঙ্গা আর যমুনোত্রীর সঙ্গম স্থলে হনুমান চটি – যমুনোত্রী থেকে দূরত্ব ১৩ কিলোমিটার। প্রাকৃতিক দৃশ্য মনোরম। রয়েছে অনেক থাকার জায়গাও। জানকী চটি থেকে ৬ কিলোমিটার চড়াই পথে ছিলো যমুনা মায়ের মন্দির। ফেরার সময়ে সেই পথই হয়ে গেলো ১৩ কিলোমিটার, যদিও উৎরাইতে।

যা হোক্‌, এখান থেকে বাস আমাদের সকলকে নিয়ে পৌঁছলো রানাচটির এক হোটেলে। আজ এখানেই রাত্রিবাস, কাল সকালেই রওনা হয়ে দেরাদুন থেকে দুন এক্সপ্রেস ধরে সোজা কলকাতা।

ট্রেনে তখনও এ.সি. ক্লাস চালু হয়নি। আমাদের সবার টিকিটই থ্রি-টায়ার স্লিপার ক্লাসে। ট্রেনে যেতে যেতে ভাবতে লাগলাম কতো প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে দিয়েও আমি আমার ভ্রমণ সমাপ্ত করে সকলকে নিয়ে সুস্থ শরীরে ঘরে ফিরছি। এর চেয়ে আর বেশী আমি কি চাইতে পারি?

এতো বছর ধরে আমি উন্মুক্ত প্রকৃতির মাঝে পর্বত থেকে পর্বতান্তরে খুঁজে ফিরেছি প্রকৃতির রংবদল। কিন্তু নদীও যে ক্ষণে ক্ষণে রং বদলায়, তারও যে রয়েছে এতো রূপবৈভব তা তো আগে আমার চোখে পড়েনি। আজ চারধাম বেড়াতে এসে আমি এইসব নদী – গঙ্গা, যমুনা, অলকানন্দা, মন্দাকিনীর রূপবৈচিত্রের সাক্ষী হলাম। এর আগেও তো আমি নদী দেখেছি – কিন্তু কোনোওদিনও তাদের পৃথক বলে মনে হয়নি। মনে হয়েছে তারা যেন প্রকৃতির সঙ্গেই অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে রয়েছে। কিন্তু এবার আমি অনুভব করেছি সব নদী একরকম হয় না। তাদেরও রয়েছে পৃথক সত্ত্বা। কখনোও সে আপাত বর্ণহীন, কখনোও নীল, সবুজ বা কাল্‌চে নীল, কখনোও সে ভয়াল, গর্জনরতা – পাথর ফাটিয়ে উৎসারিত হয়ে এগিয়ে চলেছে কোনোও হিমশৈল বহন করে, আবার কখনোও সে মৃদু কলতানে নুপুরের নিক্কণ তুলে এগিয়ে চলেছে উপলবন্ধুর পথে। কখনোও এক নদী অন্য নদীতে বিলীন হয়ে একাত্ম হয়ে গেছে। আবার কখনোও নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রেখেই একসঙ্গে পাশাপাশি চলেছে একে অপরের হাত ধরে। এসব দেখে আমার মনে এক চিন্তার উদয় হলো – এই যে সব নদী, যাদের আমরা মাতৃসমা মনে করি, যারা আমাদের সভ্যতার ধারক ও বাহক, আমাদেরই নিক্ষিপ্ত বর্জ্যে কেন আমরা তাদের দূষিত বা কলুষিত করি? আমরা কি কোনোওদিনও ভেবে দেখেছি যে, আমাদের আবর্জনা বুকে বহন করতে করতে একদিন যদি তাদের গতি রুদ্ধ হয়ে যায়, সেদিন আমরা কোথায় যাবো?

— সমাপ্ত —

লেখিকা পরিচিতি
 
 
 
গোপা মিত্র

ফিজিক্স অনার্স। একসময়ে কিছুদিন শিক্ষকতা করলেও, প্রকৃতপক্ষে গৃহবধূ – কিন্তু পায়ের তলায় সর্ষে। ভ্রমণের নেশা প্রবল। ভারতের বাইরে কোথাও না গেলেও দেশের মধ্যেই প্রচুর ঘুরেছেন। পাহাড়, সমুদ্র, জঙ্গল, ঐতিহাসিক স্থান – কোনোও কিছুই বাদ নেই। এখনও সুযোগ সুবিধে হলেই বেরিয়ে পড়েন। দু-কলমের জন্যে জীবনে প্রথমবার কলম ধরা।

Author

Du-কলম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!